Skip to content

আবহবিকার কাকে বলে? যান্ত্রিক আবহবিকার ও রাসায়নিক আবহবিকার

আবহবিকার কাকে বলে, যান্ত্রিক আবহবিকার

প্রিয় পাঠকগণ, ভূগোলের আগের অধ্যায়ে আমরা আলোচনা করেছি সমভূমি সম্পর্কে। আজ আমাদের আলোচ্য বিষয় আবহবিকার (weathering) বা শিলাবিকার। আজ আমরা জানবো “আবহবিকার কাকে বলে?, আবহবিকারের শ্রেণীবিভাগ, যান্ত্রিক আবহবিকার কাকে বলে?, রসায়নিক আবহবিকার কাকে বলে?, আবহবিকারের প্রভাব, যান্ত্রিক আবহবিকার ও রাসায়নিক আবহবিকারের পার্থক্য” ইত্যাদি।

আবহবিকার কাকে বলে ?

আবহবিকার এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। এটি হল মাটি সৃষ্টির প্রাক প্রস্তুতি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিলা ভেঙে ছােটো ছােটো খণ্ডে বা শিলাচূর্ণে পরিণত হয়। ভূত্বক বিভিন্ন শিলা দ্বারা গঠিত। সাধারণভাবে ভূত্বকের বিভিন্ন শিলার বিকারকে আবহবিকার বলে।

আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদানের প্রভাবে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একই স্থানে থেকে শিলারাশির ভেঙে যাওয়া বা বিয়ােজন হওয়াকে আবহবিকার বলা হয়।আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান।
যেমন— সূর্যতাপ, বায়ুর চাপ, বায়ুর আদ্রর্তা, বৃষ্টিপাত বায়ুপ্রবাহ, তুষারপাত, হিমবাহ প্রভৃতির প্রভাবে শিলাবিকার প্রক্রিয়া কার্যকর হয়।

আবহবিকারের শ্রেণিবিভাগ

আবহবিকার সাধারণভাবে দুটি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়, যেমন— (ক) যান্ত্রিক আবহবিকার। (খ) রাসায়নিক আবহবিকার। এই দুটি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা হলেও কোনাে একটি একক প্রক্রিয়ায় আবহবিকার সহজেই ঘটে না। দুটি প্রক্রিয়ার সম্মিলিত প্রভাবে সহজেই আবহবিকার ঘটে।

যান্ত্রিক আবহবিকার (Mechanical weathering)

যান্ত্রিক আবহবিকার কাকে বলে ?

তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, তুষার, হিমবাহ প্রভৃতির প্রভাবে স্বাভাবিকভাবে বা প্রাকৃতিক উপায়ে শিলাসমূহের ভেঙে টুকরাে টুকরাে হওয়াকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে। এই প্রক্রিয়ার ফলে শিলা বা শিলার মধ্যবর্তী খনিজের নিজের কেবল ভৌত পরিবর্তন হয়।

যান্ত্রিক আবহবিকার – এর প্রক্রিয়া ভূবিজ্ঞানী পেরি রাইশ (Perry Reiche) – এর মতে প্রধানত পাঁচটি প্রক্রিয়ায় যান্ত্রিক আবহবিকার সম্পন্ন হয় । এগুলি হল—

শিলার বােঝা লাঘবজনিত প্রসারণ:

ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের শিলা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অপসারিত হলে শিলার ওপর চাপ কমে যায়। ফলে নীচের শিলাস্তর প্রসারিত হয়ে ফাটলের সৃষ্টি করে এবং ফাটল বরাবর শিলাস্তর গুলাে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে ভেঙে যায়। গ্রানাইট শিলা দ্বারা গঠিত অঞ্চলে শল্কমােচন ; চুনাপাথর , বেলেপাথর প্রভৃতি শিলা গঠিত অঞ্চলে চাঙ্গর ভাঙন (spalling) এই প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়।

শিলার তাপ পরিবর্তনজনিত সঙ্কোচন প্রসারণ :

অধিক তাপে শিলার আয়তন বেড়ে যায় এবং তাপ হ্রাসে শিলার আয়তন সঙ্কুচিত হয়। দিন – রাত্রির বিভিন্ন সময়ে এবং ঋতু পরিবর্তনের ফলে বিভিন্ন ঋতুতে যে তাপের তারতম্য হয় তার প্রভাবে ক্রমান্বয়ে প্রসারণ ও সঙ্কোচনের ফলে শিলা ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়। নানাভাবে এই প্রক্রিয়া ঘটে থাকে-

  • প্রস্তর চাই বিচ্ছিন্নকরণ (Block disintegration): শিলা তাপের কুপরিবাহী বলে উন্ন অঞ্চলে সূর্যতাপে শিলার ওপরের স্তর যতটা উত্তপ্ত হয়, নীচের স্তর ততটা উত্তপ্ত হয় না। এজন্য অসমভাবে সঙ্কোচন ও প্রসারণের ফলে শিলার মধ্যে প্রবল অভ্যন্তরীণ পীড়নের সৃষ্টি হয়। এর ফলে শিলার মধ্যে একাধিক অনুভূমিক ও উলম্ব ফাটলের সৃষ্টি হয়। একসময় বিভিন্ন ফাটলের মধ্যবর্তী শিলারাশি চাইয়ের আকারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। একে প্রস্তর চাই বিচ্ছিন্নকরণ বলে।
  • ক্ষুদ্রকণা বিশরণ (Granular disintegration) : বিভিন্ন খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত শিলাগুলি খুব গরমে বা ঠান্ডায় সমানভাবে প্রসারিত বা সঙ্কুচিত হয় না। এর ফলে শিলার মধ্যে অসমভাবে টানের সৃষ্টি হয়। একসময় বিভিন্ন খনিজের সীমা বরাবর প্রচণ্ড শব্দে শিলাগুলি ফেটে চুরমার হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এই পদ্ধতিকে ক্ষুদ্রকণা বিশরণ বলে।
  • শল্কমােচন ( Exfoliation ) : ‘শল্কমােচন ‘ শব্দের অর্থ হল শিলার ওপরের ছাল বা খােলস উঠে আসা। একই ধরনের খনিজের সংমিশ্রণে গঠিত শিলাগুলি অসমভাবে সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হওয়ার ফলে ওপরের দিকে বেশি প্রসারিত হয়। ফলে ওপরের স্তরটি পেঁয়াজের খােসার মতাে পরপর খুলে যায়। এই পদ্ধতিকে শল্কমােচন বা গােলাকৃতি শিলাবিকার বলে। গ্রানাইট জাতীয় শিলায় এরূপ শিলাবিকার বেশি দেখা যায়।
  • বােল্ডার ভাঙন (Boulder cleaving) : অনেক সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত শিলার মধ্যে বড়াে বড়াে বােল্ডার বা পাথরের খণ্ড অবস্থান করে। তাপের প্রভাবে এরূপ শিলার উপরিভাগের অংশ প্রসারিত হলেও ভূমি দ্বারা আবদ্ধ অংশ তেমন প্রসারিত হতে পারে না। একসময় অসমান পীড়নের ফলে বােল্ডার সহ শিলা ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই পদ্ধতিকে বােল্ডার ভাঙন বলে।

আরও পড়ুন:

রাসায়নিক আবহবিকার (Chemical weathering)

রাসায়নিক আবহবিকার কাকে বলে?

বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান (যেমন কার্বন ডাইঅক্সাইড, অক্সিজেন, জলীয় বাষ্প) এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রভাবে শিলাসমূহ যখন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে যায় তখন তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে। রাসায়নিক আবহবিকারে শিলার মধ্যবর্তী খনিজগুলি পরিবর্তিত হয়ে গৌণ খনিজে পরিণত হয় বলে সহজেই শিলাসমূহ ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়।

রাসায়নিক আবহবিকার – এর প্রক্রিয়া প্রধানত সাতটি প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক আবহবিকার সংঘটিত হয়। এগুলি হল— অক্সিডেশান বা জারণ, বিজারণ, কার্বনেশন বা অঙ্গার যােজন, হাইড্রেশান বা জলযােজন, হাইড্রোলিসিস বা আদ্র বিশ্লেষণ, দ্রবণ এবং জৈবিক রাসায়নিক আবহবিকার।

  • অক্সিডেশান বা জারণ (Oxidation) : জলে অক্সিজেন দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। লােহাযুক্ত শিলা খনিজের সঙ্গে জল সম্পৃক্ত অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়াকে অক্সিডেশান বা জারণ বলে। এর ফলে লােহার ওপর হলদে বা বাদামি রঙের এক নতুন যৌগ পদার্থের সৃষ্টি হয় ও লােহায় সহজে মরিচা পড়ে এবং লােহাযুক্ত শিলাখনিজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
    [ 4FeO + O2 → 2Fe203 ]
  • বিজারণ (Reduction) : জারণের বিপরীত প্রক্রিয়া হল বিজারণ। শিলার গুলি অধিক জলপূর্ণ হলে বা জৈব পদার্থের অধিক বিয়ােজনের ফলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে অক্সিজেন অপসারিত হলে শিলার মধ্যে বিজারণ প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। এর ফলে শিলার স্বাভাবিক কাঠিন্য হ্রাস পায় এবং একসময় শিলা ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়।
    [ Fe2O3 + H2 → 2FeO + H20 ]
  • কার্বনেশন বা অঙ্গার যােজন (Carbonation) : কার্বনেশন বা অঙ্গার যােজন হল বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাইঅক্সাইডের সঙ্গে জলের রাসায়নিক সংযােগে উৎপন্ন কার্বনিক অ্যাসিডের [ HQO + CO2 → HCO3 ] ক্রিয়ায় কার্বনেট লবণ গঠন। চুনাপাথরের ওপর কার্বনিক অ্যাসিডের বিক্রিয়ায় ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট গঠিত হয়।
    [ CaCO3 + HCO3 → Ca(HCO3) 2 ]

আবহবিকারের প্রভাব

1) ভূপৃষ্ঠে আবহবিকারের প্রভাব অপরিসীম। আবহবিকারের ফলে ভূমিরূপের কিছু পরিবর্তন ঘটে (গ্রানাইট শিলায় গােলাকৃতি ভূমিরূপ ও টর , ব্যাসল্ট শিলায় বহুভূজ আকৃতির দারণ প্রভৃতি)।
২) আবহবিকারের ফলে শিলাসমূহ চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে রেগােলিথ নামে ভূ-আস্তরণ সৃষ্টি করে । চুনাপাথরযুক্ত অঞলে এরূপ ভূ-আস্তরণকে টেরারসা বলে।
3) রাসায়নিক আবহবিকারের ফলে বক্সাইট, জিপসাম, কেওলিন, লিমােনাইট প্রভৃতি খনিজের সৃষ্টি হয়। শিলাবিকার প্রত্যক্ষভাবে মাটি সৃষ্টিতে সাহায্য করে।
4) রাসায়নিক আবহবিকারের প্রভাবে বিভিন্ন খনিজ দ্রব্য মাটির সঙ্গে মিশে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। তা আবহবিকারের ফলে দ্রবীভূত খনিজ দ্রব্যগুলি উদ্ভিদের প্রয়ােজনীয় খাদ্যের জোগান দেয়।
5) শীতল জলবায়ু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকারের ফলে মাটির বড়াে বড়াে খণ্ডগুলি ভেঙে যায় বলে কৃষিকাজের সুবিধা হয়। আবহবিকারের ফলে শিলা চূর্ণের ক্ষয় ও অপসারণ প্রক্রিয়া সহজ হয়।

যান্ত্রিক ও রাসায়নিক আবহবিকারের পার্থক্য

যান্ত্রিক আবহবিকাররাসায়নিক আবহবিকার
বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে শিলাসমূহ যখন স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক উপায়ে ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়, তখন তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে।বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শিলাসমূহ যখন ভেঙে টুকরাে টুকরাে হয়ে যায়, তখন তাকে রাসায়নিক আবহবিকার বলে।
যান্ত্রিক আবহবিকারে শিলার কেবলমাত্র আকৃতিগত বা ভৌত পরিবর্তন হয়, কোনাে রকম রাসায়নিক পরিবর্তন হয় না।রাসায়নিক আবহবিকারে শিলার ভৌত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক পরিবর্তনও সংঘটিত হয়।
বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উপাদান, উদ্ভিদ ও জীব জন্তুর প্রভাবে স্বাভাবিক উপায়ে যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটে।জল , বিভিন্ন গ্যাসীয় উপাদান ও উদ্ভিদ এবং জীবজন্তুর প্রভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে।
উষ্ণ মরু ও মরু প্রায় অঞল , উচ্চ পার্বত্য অঙুল এবং শীতল অঞলে যান্ত্রিক শিলা বিকার অধিক সংঘটিত হয়।উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকার বেশি হয়।
যান্ত্রিক আবহবিকার প্রক্রিয়া প্রতিদিনই দেখা যায় , তার অগ্রগতিও লক্ষ করা যায়।রাসায়নিক আবহবিকারের প্রক্রিয়া নিঃশব্দে ঘটে যায় , সহজে লক্ষ পড়ে না।

আশা করি বন্ধুরা, আমাদের এই post টি ভাল লেগেছে। যদি ভাল লেগে থাকে তাহলে বন্ধু ও বান্ধবী দের সাথে share করুন। ভবিষ্যতে আরকম আরও পোস্ট তাড়াতাড়ি update পেতে যুক্ত হন আমাদের whatsapp/telegram চ্যানেল এ।

Share this

Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram

Related Posts

Comment us

2 thoughts on “আবহবিকার কাকে বলে? যান্ত্রিক আবহবিকার ও রাসায়নিক আবহবিকার”

  1. Pingback: নদীর ক্ষয়কার্য কাকে বলে | নদীর ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরুপ – Studious

  2. Pingback: হিমবাহের ক্ষয়কার্যের ফলে সৃষ্ট ভূমিরূপ চিত্রসহ | হিমবাহের ক্ষয়কার্য – Studious

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Facebook Page