বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, তাদের উৎস ও অভাবজনিত ফল

জীবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির জন্য ভিটামিনের মত খনিজ পদার্থ বা খনিজ লবনও একান্ত অপরিহার্য। খনিজ পদার্থ প্রধানত কখন-গঠনে সহায়তা করে। উদ্ভিদেরা মূলের সাহায্যে মাটি থেকে যে জল-শোষণ করে, সেই জলে বিভিন্ন রকম খনিজ পদার্থ দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। সুতরাং উদ্ভিদ জল-শোষণের মাধ্যমে দেহে খনিজ পদার্থ গ্রহণ করে। প্রাণীরা প্রধানত উদ্ভিজ্জ খাদ্য গ্রহণ করে খনিজ পদার্থ পায়। আমরা শাক-সবজি , ফল-মূল, দুধ, ডিম, মাছ এবং পানীয় জলের মাধ্যমে আমাদের খনিজ পদার্থের চাহিদা পূরণ করি। নীচে জীবদেহের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থগুলির উৎস, পুষ্টিগত গুরুত্ব ও অভাবজনিত ফল উল্লেখ করা হল :


1. লৌহ (Fe) : 

লৌহ রক্তের একটি প্রধান উপাদান। প্রতি 100 ml রক্তের লৌহের পরিমান 8-10 mg। যকৃৎ, প্লীহা, অস্থিমজ্জা এবং লোহিত রক্ত কণিকায় যারা সঞ্চিত থাকে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রতিদিন প্রায় 10-12 mg লৌহের প্রয়োজন

উৎস : উদ্ভিজ্জ- ফুলকপির পাতা, নটেশাক, নিমপাতা প্রভৃতি সবুজ সবজি এবং ভুট্টা, গম, বাদাম, বাজরা ইত্যাদি।প্রাণীজ– মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি।
পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ :

উদ্ভিদদেহে ক্লোরোফিল গঠনে এবং প্রাণীদেহে হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে।

অভাবজনিত ফল :

(1) উদ্ভিদদেহে ক্লোরোসিস বা পাণ্ডুরোগ হয়। এই রোগে গাছের সবুজ অংশ হলুদ বর্ন ধারণ করে।

(2) প্রাণীদেহে হিমোগ্লোবিনের পরিমান কমে গিয়ে রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া রোগ হয় (মানুষের 100 ml রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমান 14.5 gm)।

 

ক্যালসিয়াম (Ca) :

এটি প্রাণীদের অস্থি ও দন্তের একটি প্রধান উলাদান। মানুষের মোট ওজনের 2% ক্যালসিয়াম থাকে। ক্যালসিয়াম প্রধানত অস্থিতে(90%)সঞ্চিত থাকে। রক্তে এবং লসিকাতেও এর উপস্থিতি লক্ষণীয়। বাড়ন্ত শিশুদের প্রত্যহ 1.4 gm ক্যালসিয়ামের প্রয়োজন

উৎস : উদ্ভিজ্জ– ডাল, ফুলকপি, লেবু, গাজর, ফল, পালংশাক, বাঁধাকপি ইত্যাদি। প্রাণীজ– দুধ, ডিম, চুনো মাছ/ ছোটমাছ ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরত্ব বা কাজ : 

(1) উদ্ভিদদেহে মূল গঠনে এবং মূলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উদ্ভিদের কোষপ্রাচীর গঠনেও সহায়তা করে।

(2) প্রাণীদের অস্থি ও দন্ত গঠনে, রক্ত তঞ্চনে, হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক কুঞ্চনে এবং পেশির সঞ্চালন সহায়তা করে।
অভাবজনিত ফল :
(1) উদ্ভিদের মূলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

(2) প্রাণীদেহে রিকেট ও অস্টিওম্যালেসিয়া রোগ হয় এবং দন্তোদ্গম স্বাভাবিকভাবে হয় না বা দন্তোদ্গমে দেরি হয়।
(3) রক্ত তঞ্চনে বিঘ্ন ঘটে এবং রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমান কমে গিয়ে টিটেনি রোগ হয়।

আরও পড়ুন:

 

ফসফরাস (P) : 

ফসফরাসও ক্যালসিয়ামের মত অস্থির একটি প্রধান উপাদান। ফসফরাস অস্থি, যকৃৎ এবং রক্তরসে সঞ্চিত থাকে। বাড়ন্ত শিশুর প্রত্যহ 1.5 gm এই লবণের প্রয়োজন।

উৎস : উদ্ভিজ্জ– দানা শস্য, শিম, মটরশুঁটি ইত্যাদি।

প্রাণীজ– দুধ, ডিম, মাছ, মাংস ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ :

(1) প্রাণীদের অস্থি ও দন্ত গঠন করা এর প্রধান কাজ;

(2) তাছাড়া স্নেহ পদার্থের বিপাকে, নিউক্লিওপ্রোটিন গঠনে এবং

(3) কোষ বিভাজনেও এর বিশেষ ভূমিকা আছে।

(4) উদ্ভিদের নিউক্লিয়াস গঠনে এবং কোষ-বিভাজনে সহায়তা করে।

 

অভাবজনিত ফল : এই লবনের অভাবে প্রাণীদেহে রিকেট, অস্থিক্ষয়, দন্তক্ষয় ইত্যাদি রোগ দেখা দেয়। উদ্ভিদদেহে ফসফরাসের অভাবে উদ্ভিদের সাধারণ বৃদ্ধি ভাল হয়না এবং পাতা অসময়ে ঝরে পড়ে। পাতা নীল বর্ন ধারণ করে।


4. আয়োডিন (I) :

এটি প্রাণীদেহে থাইরক্সিনের একটি প্রধান উপাদান । একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রত্যহ প্রায় 0.05 mg এই লবন প্রয়োজন।

উৎসসামুদ্রিক মাছ, সামুদ্রিক মাছের যকৃৎ নিঃসৃত তেল, সামুদ্রিক লবন, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, আয়োডিন মিশ্রিত পানীয় জল ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : এটি প্রাণীদেহে থাইরক্সিন- গঠনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে।

অভাবজনিত ফল : এর অভাবে প্রাণীদেহে গলগন্ড রোগ হয় এবং রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমান বৃদ্ধি হয়।

5. সোডিয়াম (Na) : 

এটি রক্তের একটি প্রধান উপাদান। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের প্রতিদিন প্রায় 5-10 gm সোডিয়ামের প্রয়োজন।

উৎস : খাদ্য-লবন, দুধ, শাক-সবজি, খর-জল ইত্যাদিতে এই লবন পাওয়া যায় ।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : সোডিয়াম রক্ত, লসিকা, পাচক রস ইত্যাদির প্রধান উপাদান । এর হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক সঙ্কোচনে সহায়তা করে, স্নায়ুকে উদ্দীপ্ত করে ও অভিস্রবন চাপ নিয়ন্ত্রণ করে।

অভাবজনিত ফল : এর অভাবে রক্ত পাতলা হয়ে যায়, দেহ শীর্ণ হয় এবং ওজন কমে যায়। তাছাড়া স্নায়বিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ও বৃক্কের কাজে ঘাটতি দেখা যায়।


6. পটাশিয়াম (K) : 

এটি স্নায়ুকোষের একটি বিশেষ উপাদান। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের গড়ে প্রায় 4 gm. পটাশিয়াম প্রয়োজন।

 উৎস : উদ্ভিজ্জ– শাক-সবজি এবং ফল এবং ফলমূল। প্রাণীজ : মাছ, মাংস ও ডিম।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : প্রাণীদেহে এই লবণ স্নায়ুকোষ গঠন করে। CO2 গ্যাস পরিবহন করে এবং পেশী-সঙ্কোচন রোধ করে। সাধারণত পটাশিয়াম ক্যালসিয়ামের বিপরীত কাজ করে।

উদ্ভিদদেহে প্রোটিন সংশ্লেষ ও শর্করা বিপাকে সহায়তা করে এবং জলের পরিমান নিয়ন্ত্রনে সহায়তা করে।

অভাবজনিত ফল : এই লবণের অভাবে প্রাণীদেহে স্নায়বিক বিশৃঙ্খলা , অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, পেশী-সঙ্কোচনে শিথিলতা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। এই লবনের অভাবে উদ্ভিদের সামগ্রিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়, পাতায় বাদামি বর্ণের ছোপ পড়ে এবং পাতা ঝরে পড়ে।


7. ম্যাগনেশিয়াম (Mg) : 

এটি উদ্ভিদের ক্লোরোফিলের একটি বিশেষ উপাদান।প্রাণীদেহে পেশীকোষ, অস্থিকোষ ও স্নায়ুকোষ গঠনের জন্য এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আমাদের দেহে প্রতিদিন গড়ে 0.6 gm. ম্যাগনেশিয়াম লবণের প্রয়োজন।

উৎসউদ্ভিজ্জ– সবুজ বা টাটকা শাক-সবজি। প্রাণীজ– মাংস, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি।

পুষ্টিগত গুরুত্ব বা কাজ : উদ্ভিদদেহে ক্লোরোফিল গঠনে এবং প্রাণীদেহে কোষ-গঠনে, বিশেষ করে স্নায়ুকোষ, পেশীকোষ এবং অস্থিকোষ গঠনে সহায়তা করে। পেশী ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাগনেশিয়াম।

অভাবজনিত ফল : এই লবণের অভাবে উদ্ভিদদেহে ক্লোরোসিস রোগ হয় এবং প্রাণীদেহে হৃদস্পন্দনের হার বেড়ে যায়, অস্থি ভঙ্গুর হয় এবং স্নায়ু দৌর্বল্য দেখা যায়।

 জল (WATER) : 

প্রটোপ্লাজমের শতকরা 60-90 ভাগই জল। আমাদের রক্তে 90-92% জল থাকে; পেশিতে থাকে প্রায় 50%। মানবদেহে ওজনের শতকরা 60-70 ভাগই জল। জলের মাধ্যমেই কোষে নানান বিপাকীয় পরিবর্তন ঘটে। অনেক জৈব কোষ-মধ্যস্থ জলে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। কাজেই জল জীবদেহের অন্যতম দ্রাবক। কোষে অভিস্রবন চাপ জলের পরিমানের ওপর নির্ভর করে। কোষ থেকে কোষান্তরে বিভিন্ন অনুর ব্যাপন ও অভিস্রবন (আস্রাবন) প্রধানত জলের সাহায্যেই ঘটে। স্থলজ উদ্ভিদ মুলরোম দিয়ে মাটি থেকে জল শোষণ করে এবং জলজ উদ্ভিদ দেহের সমস্ত তল দিয়েই জল শোষণ করতে পারে। প্রাণীরা জল পান করে এবং বিভিন্ন খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে জল গ্রহণ করে।

জীবদেহে জলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলি হল : 

1. জল কোষের প্রোটোপ্লাজমকে সিক্ত ও সজীব রাখে এবং কোষের বিপাক-ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে।
2. জল কোষান্তর ব্যাপন ও অভিস্রবনে সহায়তা করে।
3. জল জীবদেহকে শীতল রাখে।
4. জল কোষে অভিস্রবণজনিত রসস্ফীত নিয়ন্ত্রণ করে জীবকোষ ও জীবের আকৃতি, বৃদ্ধি প্রভৃতি বজায় রাখে।
5. উদ্ভিদ জল -শোষণের মাধ্যমে বিভিন্ন খনিজ লবন গ্রহণ করে এবং জলের মাধ্যমেই পরিবহন করে।
6. উদ্ভিদ পাতায় উৎপন্ন খাদ্য রস জলের সাহায্যে কোষ থেকে কোষান্তরে পরিবহন করে।
7. জল উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় একটি প্রয়োজনীয় উপাদান।
8. জল বীজের অঙ্কুরোদগমে সহায়তা করে।
9. উদ্ভিদ বাষ্পমোচন প্রক্রিয়ায় দেহের অতিরিক্ত জল বাষ্প আকারে মুক্ত করে দেহে জলের ভারসাম্য বজায় রাখে এবং দেহকে শীতল করে।
10. জল খাদ্যকে তরল এবং পরিপাক উপযোগী করে তোলে।
11. জল রক্ত, লসিকা ইত্যাদিকে তরল রেখে প্রাণীদেহে সংবহনা সহায়তা করে।
12. জল ঘর্মাকারে এবং মূত্রাকারে প্রাণীদেহের বিপাকীয় দূষিত পাদার্থগুলিকে দেহ থেকে দূরীভূত করে।
13. জীবদেহের তাপ-শোষণ, তাপ-পরিবহন এবং তাপ-হ্রাস প্রভৃতি ভৌত-প্রক্রিয়াগুলি মূলত জলের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।
14. জল আর্দ্র- বিশ্লেষণের দ্বারা খাদ্য বস্তুকে পরিপাক করে এবং অন্যান্য বিপাকীয় কার্য সম্পন্ন হতে সহায়তা করে।

সাধারণত দৈনিক আমাদের 3000 ml. জলের প্রয়োজন হয়। কারণ প্রায় ঐ পরিমান জল প্রত্যহ আমাদের দেহ থেকে নির্গত হয়। মূত্রের সঙ্গে 1500 ml., ঘামের সঙ্গে 800-1000 ml., নিঃশ্বাসের সঙ্গে 300 ml. এবং মলের সঙ্গে 200 ml. জল নির্গত হয়।

জীবদেহের জলের প্রধান ভুমিকাগুলি হল :    প্রোটোপ্লাজমের সক্রিয়তা বজায় রাখা, বীজের অঙ্কুরোদগমে সহায়তা করা, উদ্ভিদের পরিবহনে সহায়তা করা, প্রাণীর রক্ত ও লসিকা সংবহনে এবং রেচনে সহায়তা করা, খাদ্য বস্তুর পাচন ও শোষণে সহায়তা করা, ব্যাপন, অভিস্রবন ও তাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করা

1 thought on “বিভিন্ন খনিজ পদার্থ, তাদের উৎস ও অভাবজনিত ফল”

Leave a Comment